প্রশ্রয়ের বিষবৃক্ষ

মোঃ শফিকুল ইসলাম প্রিয়
0

প্রশ্রয়ের বিষবৃক্ষ

স্মৃতিরা কখনো মরে না। তারা আমাদের কলবের গহীনে ঘুমিয়ে থাকে। কখনো কখনো এক পশলা নীরবতার বৃষ্টিতে তারা জেগে ওঠে। ঠিক যেমন আজ জেগে উঠেছে আমার কিছু স্মৃতি, যা শেয়ার করার জন্য কলম হাতে নিয়েছি

আমার বয়স তখন কতই বা হবে? ১২ কিংবা ১৩ বছর হয়তো তারও কম। জীবনের ক্যানভাসটা তখনো সাদা। সেখানে কোনো কালির দাগ পড়েনি। নফসের সাথে তখনো আমার পরিচয় হয়নি। আমার রূহ তখনো জান্নাতের ঘ্রাণে মোহিত

সেদিন ছিল এক পড়ন্ত বিকেল। রোদের কান্না তখন উঠোনের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা পরিবারের সবাই একসাথে বসেছি। মাটির দাওয়ায় শীতল পাটি পাতা। মায়ের হাতের পায়েসের রান্নার সুবাস আর বাবার ওজুর পানির পবিত্র ঘ্রাণ মিলেমিশে এক অদ্ভুত মারেফাতের পরিবেশ তৈরি করেছে। আমরা সব কয়জন ভাই-বোন আব্বার সাথে বসে খাচ্ছি। আর মা পরিবেশন করছেন। হঠাৎ বাতাস ভারী হয়ে এলো। একটা খবর উড়ে এলো আমাদের পাড়ায়

আমাদেরই গ্রামের ও-পাড়ার একটা ছেলে ধোলাই খেয়েছে। দিনে দুপুরে শশার ক্ষেত থেকে শশা চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে সে। শুধু ধোলাই নয়। দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল ঝগড়া। মারামারি। রক্তারক্তি

খবরটা শুনে মায়ের হাত থেমে গেল। মায়ের চোখে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা। মেঘের দীর্ঘশ্বাসের মতো এক গহীন শব্দ বের হলো মায়ের কণ্ঠ থেকে। মা বললেন, "এগুলো মা-বাবার দোষ। মা-বাবার কারণেই সন্তান চুরি শেখে।"

আমার ছোট্ট মন। তখনো দুনিয়ার হিকমাহ বুঝার বয়স হয়নি। আমার ভেতরে যেন এক ঝড় বয়ে গেল। ছোট্ট কলবে প্রশ্নের পর প্রশ্ন। ছেলেটা চুরি করল, আর দোষ হলো মা-বাবার? এটা কেমন বিচার!

আমি আর থাকতে পারলাম না। আমার ভেতরে লুকিয়ে থাকা শিশুসুলভ জেদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। প্রশ্ন করেই বসলাম

"চুরি করল ছেলে, আর মা-বাবার দোষ হলো কীভাবে?"

 

মা আমার দিকে তাকালেন। সে দৃষ্টিতে ছিল এক অদ্ভুত মায়া। তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন, "মা-বাবা যদি ছেলেকে ছোটবেলায় সঠিক শিক্ষা দিত, হালাল-হারামের পার্থক্য বোঝাততাহলে ছেলেটা আজ চোর হতো না।"

মায়ের এই সহজ উত্তর আমার মনে ধরল না। আমার কাছে মনে হলো সমীকরণটা মিলছে না। আমি আবার পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম। একটু যেন অভিমান নিয়েই বললাম, "আমি যদি এখন চুরি করি, সেটা কি তোমাদের দোষ হবে?"

আশেপাশে পিনপতন নীরবতা। বাতাসের শব্দও যেন কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেল। আমি দেখলাম, আব্বা খাওয়া থামিয়ে দিয়েছেন। আব্বার চেহারায় সব সময় একটা নূরানী তাজাল্লি থাকত। তিনি যখন কথা বলতেন, মনে হতো কোনো শান্ত ঝরনা থেকে পানির ধারা রিনঝিনি আওয়াজ তুলে গড়িয়ে পড়ছে, তৃষ্ণার্ত নদীর মোহনায় মিলিত হওয়ার তৃষ্ণায়।

বাবা আমার দিকে ফিরলেন। মুখে এক স্নিগ্ধ জোসনার হাসি। তিনি বললেন, "শোনো বাবা তোমরা। তোমাদেরকে আজ একটা গল্প বলি।"

আমরা ভাই-বোনেরা সবাই নীরব। বাবার গল্প মানেই ছিল রুহানিয়াতের এক নতুন দরজা খুলে যাওয়া। বাবা বলতে শুরু করলেন

"একবার এক ভয়ংকর খুনি আসামির ফাঁসির আদেশ হলো। জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তার দিন কাটছে। লোকটার চোখ দুটো ছিল মৃত। সেখানে কোনো অনুশোচনা ছিল না। যেন তার নফস তার রূহকে পুরোপুরি গ্রাস করে নিয়েছে। তো, ফাঁসির দিন ঘনিয়ে এলো। নিয়ম অনুযায়ী জজ সাহেব আসামির কাছে জানতে চাইলেন, তার কোনো শেষ ইচ্ছা আছে কিনা।"

আমি ও আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছি। চোখের সামনে যেন দেখতে পাচ্ছি সেই অন্ধকার জেলখানা। দেয়ালগুলো যেন পাপের ভারে কাঁদছে। আর সেই কান্না জেলখানার চার দেওয়ালের প্রকোষ্ঠে নিরব প্রতিধ্বনি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

বাবা বলে চললেন, "আসামি জজ সাহেবের দিকে তাকাল। তার রুক্ষ কণ্ঠে বলল— 'আমি আমার মায়ের সাথে একটু কানে কানে কথা বলতে চাই। এটাই আমার শেষ ইচ্ছা।'”

"আদালতের নির্দেশে আসামির মাকে হাজির করা হলো। একজন বৃদ্ধা নারী। চোখের পানিতে তার বুক ভাসছে। আসামি তার মায়ের কাছে গেল। মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে গেল। সবাই ভাবল, হয়তো শেষ বিদায় নিচ্ছে ছেলে। হয়তো ক্ষমা চাইছে। তার মনের গোপন কোন অসিহত করে যাচ্ছে মা’কে। কিন্তু হঠাৎ এক ভয়াবহ কাণ্ড ঘটে গেল।"

আমরা সবাই শিউরে উঠলাম। আমি বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি

আব্বা বললেন, "আসামি কথা বলার ছলে হঠাৎ দাঁত দিয়ে তার মায়ের কান কামড়ে ধরল। এক ভয়ংকর আক্রোশে সে তার মায়ের কানটা ছিঁড়ে নিল। গলগল করে রক্ত পড়তে লাগল।"

আমার মনে হলো আমার নিজের কানটাই যেন কেউ ছিঁড়ে নিয়েছে। পায়েসের শিতল পাটিতে তখন পিন পতন নিরাবতা।

"সমবেত জনতা হৈ হৈ করে উঠল। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এ কেমন পৈশাচিকতা! নিজের জন্মদাত্রী মায়ের কান কামড়ে ছিঁড়ে নেওয়া! জজ সাহেব সাথে সাথে সবাইকে থামালেন। তিনি আসামির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন। শান্ত অথচ গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন— 'তুমি এটা কেন করলে? মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও তোমার ভেতরে এই পিশাচ কোথা থেকে এলো?'"

বাবা একটু থামলেন। তিনি আমাদের দিকে তাকালেন। তারপর আবার শুরু করলেন আসামির জবানবন্দি

"আসামি রক্তাক্ত মুখে হাসল। সে এক ভয়ংকর হাসি। সে জবাব দিল— 'জজ সাহেব, আজ আপনারা যাকে খুনি হিসেবে দেখছেন, আমি কিন্তু খুনি হয়ে এই পৃথিবীতে আসিনি। আল্লাহ আমাকে মাসুম করেই পাঠিয়েছিলেন। আমাকে খুনি বানানো হয়েছে। আর আমাকে এই ভয়ংকর খুনি বানিয়েছে আমার এই মা! তাই আমি মায়ের কান ছিঁড়ে নিয়ে আমার জীবনের প্রথম প্রতিশোধ নিলাম। আমার হাতে আজ কোনো অস্ত্র নেই, তাই তাকে আমি খুন করতে পারলাম না। কিন্তু আমার বুকের ভেতরের যে আগুন আজীবন জ্বলছে, তার একটু জ্বালা মেটানোর জন্যই আমি এই কাজ করেছি।'"

 

আদালত নিস্তব্ধ। জজ সাহেব অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, "'তোমার মা তোমাকে খুনি কীভাবে বানালো?'"

বাবা এবার আসামির কণ্ঠ নকল করে বলতে লাগলেন, তার গলায় এক অদ্ভুত হাহাকার, "'আমি যখন ছোট ছিলাম, খুব ছোট। তখন আমি ছোট ছোট জিনিস চুরি করতাম। কখনো অন্যের ক্ষেতের আলু, কখনো বেগুন, কখনো পটল। আমার মা সব দেখতেন। কিন্তু তিনি কোনোদিন আমাকে বাধা দেননি। কোনোদিন বলেননি যে এটা হারাম। অন্যের হক নষ্ট করা মহাপাপ। বান্দার হক নষ্ট করলে আল্লাহ্ কোখনই মাফ করনে না; বরং, আমি চুরি করে আনলে তিনি খুশি হতেন। পরোক্ষভাবে আমাকে উৎসাহ দিতেন

আমার নফস তখন ছোট ছিল। ছোট ছোট পাপ করতে করতে আমার কলবে জং ধরতে শুরু করল। কেউ সেই জং পরিষ্কার করে দেয়নি। আমি ছোট থেকে বড় হলাম। সেই সাথে আমার ভেতরের চোরটাও বড় হলো। ছোট চোর থেকে আমি আস্তে আস্তে সিধেল চোরে পরিণত হলাম। নফসের খিদে বাড়তে লাগল

আর আজকে? আজকে আমাকে যে খুনের অপরাধে আপনারা ফাঁসি দিচ্ছেন... জানেন সেটা কেন? ওই চুরি করতে গিয়েই আমি ধরা পড়েছিলাম। আর ধরা পড়ার পর, নিজেকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টায় আমি মানুষ খুন করে বসি। যার ফলশ্রুতিতে আজ আমার এই ফাঁসির দড়ি

জজ সাহেব, আমার এই ফাঁসির জন্য আমার মা দায়ী। আমার একটাই অনুরোধ পৃথিবীর সমস্ত মায়ের কাছে... আর কোনো মা যেন আমার মায়ের মতো তার সন্তানকে ছোট কোনো অপরাধে প্রশ্রয় না দেয়। কোনো পাপকে যেন ছোট মনে না করে। নাহলে তার পরিণতিও হবে আমারই মতো।'"

বাবার গল্প শেষ হলো। কিন্তু গল্পের রেশ আমাদের চারপাশে এক অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে দিল। আমি যেন দেখতে পাচ্ছিলাম, একটা ছোট্ট পাপ কীভাবে বিষবৃক্ষ হয়ে মানুষের অস্তিত্বকে বিলীন করে দেয়। বাবা এই ছোট্ট গল্পের মাধ্যমে আমাদের কালবে একটা নূরের বীজ বুনে দিলেন। বুঝিয়ে দিলেন, বাবা-মায়ের সঠিক শিক্ষা আর দিকনির্দেশনার অভাবেই একটা নিষ্পাপ শিশু একদিন নফসের দাস হয়ে যায়। বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ে

 

বাবা আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, "রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর আহলুল বাইতের জীবন দেখো। তাঁরা ক্ষুধার জ্বালায় পেটে পাথর বেঁধেছেন, কিন্তু কখনো হারামের এক বিন্দুও স্পর্শ করেননি। ইমাম হুসাইন (রা.) কারবালার তপ্ত মরুভূমিতে তৃষ্ণায় কাতর হয়েছেন, কিন্তু বাতিলের সাথে আপস করেননি। হালাল রিযিক হলো ইবাদতের প্রাণ। হারাম যার শরীরে ঢোকে, তার কলব মরে যায়। তার আর আল্লাহর সাথে ইশকে ইলাহির সম্পর্ক তৈরি হয় না।"

মায়ের চোখ তখন পানিতে ছলছল করছে। সেই চোখের পানি যেন সেজদার পানির মতো পবিত্র। মা ভারী গলায় বললেন, "বাবা, তোমাদের প্রতি আমাদের একটাই অনুরোধ। আজীবন মনে রেখো। কখনোই অন্যের জিনিসে হাত দেবে না। সেটা যদি অন্যের নখের কোণার মতো ছোট বা মূল্যহীনও হয়, তবুও না। অন্যের হক হলো জাহান্নামের আগুন। এই আগুন থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রেখো।"

আমি সেদিন কিছুই বলিনি। শুধু আমার ছোট্ট হৃদয়ে কথাগুলো পাথরের মতো খোদাই হয়ে গিয়েছিল

সময় নদীর স্রোতের মতো বয়ে গেছে। অনেকগুলো বছর পার হয়ে গেছে। আজ আমি আর সেই ১২/১৩ বছরের শিশু নেই। জীবনের অনেকগুলো বসন্ত আর কালবৈশাখী আমি পার করেছি

আমার সেই নূরানী চেহারার বাবা আজ আর আমাদের মাঝে নেই। গত ২০২১ সালে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর রূহ তাঁর রবের ডাকে সাড়া দিয়ে পরম শান্তিতে ফিরে গেছে। বাবার মৃত্যুর দিন আকাশটা খুব কেঁদেছিল। মনে হয়েছিল, প্রকৃতিও যেন একজন আল্লাহর ওলির বিদায়ে শোকাহত। বাবার শূন্যতা আজো আমাকে কাঁদায়। কিন্তু তাঁর দেওয়া সেই শিক্ষা, সেই নূরের বীজ আজো আমার কালবে সতেজ হয়ে আছে

মা এখনো বেঁচে আছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার অশেষ রহমত। আল্লাহ আমার মাকে নেক হায়াত দান করুন। মায়ের সেই পবিত্র দোয়া, তাঁর তাহাজ্জুদের জায়নামাজের চোখের পানি আজও আমাকে নফসের ধোঁকা থেকে ঢাল হয়ে রক্ষা করে

আজ যখন চারপাশে এত লোভ, এত দুর্নীতি, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করার এত প্রতিযোগিতা দেখি, তখন আমার বাবার সেই আসামির গল্পটা মনে পড়ে। মনে পড়ে মায়ের সেই সতর্কবাণী

আলহামদুলিল্লাহ। আমার পিতা-মাতার সেই নেক দোয়ার বরকতে, তাঁদের দেওয়া সেই আধ্যাত্মিক শিক্ষার কারণে, আজ পর্যন্ত অন্যের জিনিসের ওপর কখনো কোনো লোভ জন্মায়নি। নফস কখনো কখনো ফিসফিস করে, কিন্তু সাথে সাথেই কালবের ভেতরে বাবার সেই কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়। আমি থমকে যাই

বাকি জীবনেও আমি এই পবিত্রতা ধরে রাখতে চাই। আমি চাই আমার রূহ যেন কোনো কালির দাগ ছাড়া, এক ফোঁটা হারামের স্পর্শ ছাড়া আমার রবের কাছে ফিরে যেতে পারে। যেমনটা আমার বাবা গিয়েছিলেন। সুফিদের ফানা হয়ে যাওয়ার মতো, আমিও চাই আমার ইচ্ছাগুলো যেন আল্লাহর ইচ্ছার মাঝে বিলীন হয়ে যায়

বাকিটুকু শুধু আপনাদের দোয়া। আর আমার রবের অসীম রহমত। হে আল্লাহ, আমাদের কালবকে নফসের আঁধার থেকে রক্ষা করো, আর সেখানে তোমার নূরের তাজাল্লি ছড়িয়ে দাও। আমিন

”এই লেখাটির মেধাস্বত্ত সম্পুর্ণ লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত, লেখকের অনুমতি ছাড়া এই লেখার অংশ বিশেষ বা সম্পূর্ণাংশ অন্য কোন মিডিয়াতে প্রকাশ করা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ হিসাবে গন্য হবে।”

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

আপনার মূল্যবান মতামত দিন। আমরা আপনার কমেন্টের অপেক্ষায় আছি! দয়া করে গঠনমূলক মন্তব্য করুন এবং কোনো স্প্যাম বা বিজ্ঞাপন লিংক শেয়ার করবেন না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
3/related/default